মূল বিষয়ে যান

কেবল সন্তান নয় একজন মায়েরও জন্ম হয়!

ইচ্ছায় হোক বা অনিচ্ছায় সন্তান পালনের দায়-দায়িত্বের বেশিরভাগটাই মায়ের উপর বর্তায়। সময়মতো খাওয়ানো, গোসল-টয়লেট করানো, পড়ালেখায় হাতেখড়ি, স্কুলে আনা নেয়া, হোমওয়ার্ক করানো, এমনকি জুতোর ফিতে বাঁধতে শিখানো -সবটাই মায়ের জব ড্রেসক্রিপশনের অংশ। অসুখবিসুখে সেবা দেয়া, ডাক্তারের চেম্বার, হাসপাতালে ছুটাছুটি, ওষুধপথ্যের তদারকি –সেসবও মায়েরই দায়িত্ব। তবে এসব টুকরো টুকরো দায়িত্ব যোগ হতে হতে একসময় দায়ভার-এ পরিণত হয়ে যায়।

সন্তানের অসুখবিসুখের কারণ হিসেবে অনেকসময়ই মায়ের অসাবধানতা বা অমনোযোগিতাকে দায়ী করা হয়। সন্তান রোগাপাতলা হলে বলা হবে,মা ঠিকমতো যত্ন নিচ্ছে না,আবার বেশি মোটা হলে বলা হবে মায়ের অতি-আহ্লাদ। আর সন্তান বিপথে গেলে তো কথাই নেই –মায়ের ব্যর্থতা শতভাগ!

জন্মমূহুর্ত থেকে সন্তানের সকল দায়-দায়িত্বের বোঝা মায়ের কাঁধেই চেপে বসে। কেউ কী ভেবে দেখে যে এই “আনকোরা মা” মাত্র কদিন আগেও কেবলই একটি মেয়ে ছিল? সন্তান জন্মদানের পরপরই এতোটা প্রত্যাশা করা কি বাড়াবাড়ি নয় ? রাতারাতি একটি মেয়ের মা হয়ে ওঠা কী এতই সহজ? এ তো কেবল একটি সন্তানের জন্ম নয়, একজন মায়েরও জন্ম! প্রথমবারের মতো যে মায়ের জন্ম হলো, সে তো এমনকী কীভাবে সন্তানকে দুধ খাওয়াতে হবে তাও জানে না। দুর্বল শরীরে নির্ঘুম রাত পার করার পাশাপাশি বিভিন্ন জনের হরেক রকমের আদেশ-উপদেশ-নির্দেশে সে দিশেহারা হয়ে পড়ে। সদ্য জন্ম দেয়া একটি শিশুর মা হিসেবে নিজেকে তৈরি করার সুযোগ অথবা সময় কোথায়! সেইসাথে সবাই ধরেই নেন, সন্তানের জন্ম দেয়া মাত্রই তাকে সন্তান পালনে পারদর্শী হতে হবে। কোনো রকমের ভুল মার্জনীয় নয়।

এমন তো হতেই পারে যে এই সন্তান গর্ভে নেয়ার সিদ্ধান্তে তার শারীরিক, মানসিক বা আর্থিক প্রস্তুতি ছিল না! হতে পারে তার পড়ালেখার শেষ ধাপ পেরুনোর তখনও বাকী ছিল। কিংবা চাকরির জায়গাটা সংকটময় ছিল।এমনকি সন্তানের জন্মের কারণে অনেক মায়েরই চুকে যায় পড়ালেখার পাট। অনেকেই প্রতিকূলতার মধ্যেও আকঁড়ে থাকেন চাকরি। চোখের নিমেষেই শেষ হয় মা হওয়ার ছুটি। বাচ্চার টীকা, অসুখ-বিসুখ অথবা স্কুলের তলব- সবটাতেই ছুটি নেবার অনিবার্য দায়িত্ব মায়ের উপরেই বর্তায়। চাকরিতে বিরতি দিয়ে কিছুদিন বাড়িতে থাকার বিলাসিতা অনেক মায়ের পক্ষেই সম্ভব হয় না। হয়তো সংসার খরচের একটা বড় অংশই তাকেই বইতে হয়। এতোকিছুর পরও মায়ের দায়িত্বে কমতি হওয়া চলবে না। অফিস থেকে ফিরতে দেরি হলে মা হিসেবে দায়িত্ব পালনে অবহেলার চোখরাঙানি। অফিসে ছুটি চাইলে সহকর্মীদের ফিসফিসানি। সবমিলিয়ে সন্তান জন্ম দিয়ে অপরাধী মা তার অপরাধের মাশুল গুনেন নানাভাবে। অনেক অফিস-ফেরত মা সন্তানকে যথেষ্ঠ সময় না দিতে পারার অপরাধবোধ থেকে প্রতিদিনই হাতে করে চকলেট বা খেলনা নিয়ে বাড়ি ফিরেন। নিজের অজান্তেই তিনি হয়তো সন্তানের মধ্যে তৈরি করেন অতিরিক্ত প্রত্যাশা।

যে সময় সন্তানকে ঘিরে দায়িত্বের ওজন বাড়তির দিকে যেতে থাকে, ক্যারিয়ারের জন্য সে সময়টাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিযোগিতার বাজারে টিকে থাকার যুদ্ধে সেই সদ্য জন্ম নেয়া মায়েদের জন্য আমরা যেন একটু সংবেদনশীল হই। পরিবারের সদস্য হিসেবে, বন্ধু হিসেবে, প্রতিবেশী হিসেবে অথবা সহকর্মী হিসেবে। তাদের পথচলাকে একটু সহজ করার জন্য আসুন তাদের পাশে দাঁড়াই। একজন সদ্য জন্মানো মা-কে পরিপূর্ণ মায়ে পরিণত হতে যার যার জায়গা থেকে সহযোগিতার হাত বাড়াই।

২৫ আগস্ট ২০১৭

শেয়ার করুন

মন্তব্য

এখনো কোনো মন্তব্য নেই। আপনিই প্রথম মতামত জানান।

মন্তব্য করুন

উত্তর দিচ্ছেন

আপনার ইমেইল প্রকাশ করা হবে না। অনুমোদনের পর মন্তব্য প্রকাশিত হবে।

আরও পড়তে পারেন

সব লেখা
আপন ভাবনা

এই আইটেম

বাংলাদেশে আমাদের কাজ দেখতে আফ্রিকার চারটি দেশ থেকে ওয়াটারএইডের প্রতিনিধিদের আগমন। স্বভাবতই মাঠের কাজ দেখানোর পাশাপাশি তাদের সার্বিক যত্ন-আত্তির ভারও আমার উপর। তাদেরকে নিয়ে সাতসকালে প্লেনে চেপে সৈয়দ...

Hasin Jahan ২ মিনিট

Age is NOT just a number!

আপন ভাবনা

Age is NOT just a number!

আমাদের যাদের বয়স একটু বাড়তির দিকে তাদেরকে উদ্দেশ্য করে অনেকেই বলেন, 'age is just a number - মনের বয়সটাই আসল'। উৎসাহ দেবার জন্য হলে বিষয়টি ঠিক আছে, কিন্তু বাস্তবে ততটা সত্য নয়। মাঝবয়স পেরুলে আগের...

Hasin Jahan ২ মিনিট

আমি একজন সেকেন্ড ক্লাস নাগরিক

আপন ভাবনা

আমি একজন সেকেন্ড ক্লাস নাগরিক

মেয়ে হয়ে জন্মানোর ব্যাপারটা অনেকটা দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিকের মতো! কেমন করে? একটু ভেঙেই বলি। তা, বহু বছর আগের কথা। তখন আমার বয়স আট কি দশ।বিকেল হলেই বাইরে খেলতে যেতাম। হঠাৎ একদিন সমন জারি হলো- বড় হয...

Hasin Jahan ২ মিনিট