আমার এক পায়ে পথ চলা
প্রায় বছর তিনেক আগে, হঠাৎ করেই আমার ডান পায়ের হাঁটুতে সমস্যা দেখা দিল। আমি সমতলে চলাফেরা করতে পারি কিন্তু একেবারেই সিঁড়ি ভাঙ্গতে পারি না, এমনকি একধাপ ওঠানামা করাও আমার জন্য দুরূহ হয়ে পড়লো। শুরু হলো ডাক্তার-এক্সরে। প্রথমেই ট্রমা সেন্টারে গেলাম। ডাক্তার এক্সরে দেখে একমনে ওষুধ আর ফিজিওথেরাপী লিখে চলছেন। আমি জানতে চাইলাম, আমার কি হয়েছে? উনি বললেন যে আমার হাঁটুর মাঝের ফাঁক কমে আসছে তাই ব্যথা। আমি পরের প্রশ্নে জানতে চাইলাম যে, আমার বাঁ হাঁটুর এক্সরেতেও তো একই অবস্থা, তবে সেই হাঁটুতে ব্যথা নেই কেন? উনি মোটামুটি রক্তচক্ষু মেলে তাকালেন। আমি সাথে সাথেই বুঝলাম- ভুল করে ফেলেছি। রোগী হিসাবে এর চেয়ে বেশী জানবার অধিকার আমার নেই। অতএব পরদিন থেকে আমার ফিজিওথেরাপী শুরু। ট্রমা সেন্টার- যা আমার মত রোগীদের সেবার জন্য একটি নামকরা হাসপাতাল, সেখানে ১৭ টি সিঁড়ি বেয়ে গ্রাঊন্ড ফ্লোরে পৌঁছলাম। লিফটে চড়ে ওখানে যাবার বিকল্প পথটি আন্ডারগ্রাউন্ডে এবং সেটা সাধারণত আমবুলেন্সে করে আসা রোগীদের জন্যই ব্যবহৃত হয়। যাহোক, এবার ফিজিওথেরাপী নেয়ার পালা, খোঁজ করে জানলাম অভিজ্ঞ কোন মহিলা থেরাপিষ্ট নেই। যিনি আমাকে ফিজিওথেরাপী দেয়া শুরু করলেন তার কাছে প্রশ্ন রাখলাম, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ কি ভেবে দেখেছে যে ১৭টা সিঁড়ি ভেঙ্গে আসাটা রোগীদের জন্য কতটা কষ্টসাধ্য। ভদ্রলোক আনন্দের সাথে আমাকে তখন শানে নু্যুল বললেন। এই ভবনের সত্বাধিকারি প্রাক্তন স্বাস্থ্যমন্ত্রী । তিনি অতিশয় কৃপণ এবং তিনি এই ভবনটির নক্সা তিনি তার এক বন্ধুপুত্র, আর্কিচেকচারের ছাত্রকে দিয়ে কম খরচে করিয়েছেন। তার ভাষায় এটা কৃপনতা আর অনভিজ্ঞতার ফলাফল। কয়েকদিনের মধ্যেই বুঝলাম থেরাপী নেয়ার লাভের চেয়ে সিঁড়ী বাওয়ার কষ্ট অনেক বেশী।
এবার পুনরুদ্দোমে বিখ্যাত সি আর পি (সাভার)এ গেলাম। সেখান থেকে দেখিয়ে মিরপুর সি আর পি তে আসলাম থেরাপী নিতে। এখানে একেবারে বিদেশী নিয়ম কানুন, সময় ৯-৫টা, অ্যাপয়েন্টমেন্ট অনু্যায়ী ঘড়ি ধরে সার্ভিস দেয়া হয়। আমি একটা বেসরকারী প্রতিষ্ঠানে চাকরী করি, কাজেই আমার অফিসে উপস্থিত হবার নির্ধারিত সময় আছে কিন্তু ছুটির কোন নির্দিষ্ট সময় নেই। ভাবলাম, হায় হায়, এই সার্ভিস নিতে হলে তো আমার রিটায়ারমেন্ট ছাড়া গতি নাই। যাহোক অফিস থেকে একমাসের অনুমতি নিলাম যে সকালে থেরাপী নিয়ে অফিসে যাবো আর বাড়তি সময় কাজ করে সেটা পুষিয়ে দেব। এবার অ্যাপয়েন্টমেন্ট নেবার পালা। কিন্তু হায়, দেখলাম পরবর্তী একমাসের সকালের এবং শেষ বিকালের দিকের সব স্লটই বুকড।
আমাকে থেমে থাকলে চলবে না; আমি নিজেই বাসায় প্রাক্টিস করি আর পাশাপাশি প্রতিদিন হাঁটি। মোহাম্মদপুরের ইকবাল রোডে আমার ভাড়া বাসা। উচ্চ মধ্যবিত্তের গুছানো এলাকা হিসেবে এ জায়গাটা পরিচিত- ফুটপাথ সমেত প্রশস্ত রাস্তা। সময়ের সাশ্রয়ের কথা ভেবে আমি এই ফুটপাথই বেছে নিলাম। কিন্তু একি! যখনই ফুটপাথে উঠতে হয় বহুকষ্টে আমার সম্বল বাঁ পা দিয়ে উঠি আবার কয়েক কদম না যেতেই নামতে হয়। গুনে দেখলাম, এখানকার সবচেয়ে দীর্ঘ ফুটপাথটি দৈর্ঘ্য ৩২ কদম আর সবচেয়ে ছোটটার মাত্র ৩ কদম এবং ছোটগুলোর সংখ্যাই বেশী। ফুটপাথের ধারগুলো অত্যন্ত খাঁড়া। জানতে ইচ্ছা হয় কোন পারর্দশী ইঞ্জিনীয়ার এই ফুটপাথ ডিজাইন করেছেন আর কেইবা সুপারভাইস করেছেন!
দিন এভাবেই কেটে যাচ্ছে, আমিও মোটামুটি এই জীবনে অভ্যস্থ হয়ে উঠেছি, ঘরে-বাইরে। আসন্ন ঈদ ঊপলক্ষ্যে আমার স্বামী জিগেস করলেন, ঈদে কি নিবে? আমি বললাম, একটা স্টাইলিশ ওয়াকিং স্টিক নিবো। দোকানে গিয়ে বললাম আমাকে সঞ্জয় দত্তের ‘সাজন’ সিনেমার মত একটা লাঠি দেন। দোকানদার যার-পর-নাই বিরক্ত হলো। আমি তাকে আর বোঝানোর চেষ্টা করলাম না যে, এই লাঠি হবে অনেকটা আমার জীবন সঙ্গীর মত । এরপর থেকে আমি বেশ কিছুটা স্বচ্ছন্দের সাথে লাঠি নিয়ে চলাফেরা করতে থাকলাম। কিন্তু বিপত্তি বাধঁলো অন্য জায়গায়। আমি যেখানে যাই অন্য মানুষ অস্বস্তিবোধ করে, কি বলে আমাকে স্বান্তনা দেবে অথবা কি করবে তা ঠিক বুঝে ওঠে না। অফিসের কাজে নিয়মিত ঢাকার বাইরে যেতে হয়। সেখানে হয়তো দোতালা বা তিনতালায় মিটিং, একপায়ে ভর করে সিঁড়ী বেয়ে উঠতে আমার অনেক সময় লাগে। তাই সবাইকে বলি আগে চলে যেতে। কিন্তু ঢাকা থেকে আসা বড় অফিসার ভেবেই হোক অথবা শ্রদ্ধার কারনেই হোক, অনেকেই কিছুতেই আগে যান না। সেক্ষেত্রে আমাকে মহা অস্বস্তি নিয়ে সিঁড়ী বাইতে হয় । কাজের সুবাদে যেতে হয় দেশের প্রত্যন্ত এলাকায়। কখনো নৌকায়, লঞ্চে, ভ্যানে কিম্বা প্লেনে। হাঁটতে হয় মেঠো পথে। প্রথম প্রথম সাহায্যের জন্য বলতে হতো। কিছুদিন পর বুঝলাম, আমার পায়ের সমস্যাটা মোটামুটি অনেকেই জেনে গেছেন। নিসঃকোচে অনেকেই সাহায্যের হাত বাড়ান। একবার বোট থেকে নামার সময় খুব অসহায় লাগল, মনে হলো, কয়েকদিন আগেও এটুকু এক লাঁফে পার হতাম। ঠিক এসময়ে আমাকে নিতে আসা এক সহকর্মী আমার দিকে হাত বাড়িয়ে দিল। ছেলেটার মুখে দাঁড়ি, মাথায় টুপি। আমি অকপটে তার হাতটা ধরলাম। কে কিভাবে নেবেন জানিনা, তবে আমার জানি এই আন্তরিকতার কোন খাদ ছিলনা।
আমি তখনও আশা ছাড়ি নাই। এবার গেলাম ব্রাকের মোহাম্মদপুরের সেন্টারে। অবশেষে দেখা পেলাম মহিলা থেরাপীষ্টের। পেলাম সকালের স্লট আর উপরে ব্রাকের এক কর্মীর রেফারেন্সে যাওয়ায় পেলাম ডিসকাউন্ট। আমি তো আনন্দে আলহাদিত। কিন্তু বিধিবাম। দুজন থেরাপীষ্টের মধ্যে একজন গেলেন মাতৃকালীন ছুটিতে। যিনি আছেন তিনি নিয়মিত দেরী করে আসেন আর থেরাপীর চেয়ে গল্পেই তার বেশী আগ্রহ। কদিন পর তিনিও তার শারিরিক কারনে লম্বা ছুটি নিলেন আর আমিও ধৈর্য্য হারালাম।
এরপর আসলো সুবর্ণ সুযোগ। অফিসের কাজে ব্যাংকক যাব। নিজ খরচে বাড়তি কদিন থেকে ডাক্তার দেখিয়ে আসবো। নানা পরীক্ষা নিরীক্ষা শেষে ডাক্তার জানালেন আমার পায়ের নার্ভ নষ্ট হয়ে গেছে। আমি আর কখনও ভালো হবো না। শুনে আমি মোটামুটি হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম- যাক আর চিকিৎসা করানো লাগবেনা। মধ্যবিত্তের সবচেয়ে বড় আকাঙ্ক্ষা ব্যাংককে চিকিৎসা করানো, সেটাও পূর্ণ হলো। দেশে ফেরার পরে যখন সবাইকে চিকিৎসার ফলাফল জানালাম, তখন দেখি আমার ছোটছেলে চোখে পানি টলটল করছে। আমি সহজ গলায় বোঝানোর চেষ্টা করলাম, এখনও তো আমার একপা ভালো আছে, যখন ওটাতেও সমস্যা হবে তখন হুইল চেয়ার নিয়ে চলাফেরা করবো। আমি কিছুতেই থেমে থাকবোনা।
প্রায় মাস ছয়েক হলো, হঠাৎ আবিস্কার করলাম কখন যেন আমি দুপায়ে চলা শুরু করেছি; আজকাল সিঁড়ীও ভাঙ্গতে পারছি। আশ্চর্যজনকভাবে চিকিৎসাবিদ্যাকে ভুল প্রমান করে এখন আমি দুই পায়ে ভর করে চার-পাঁচ তলা পর্যন্ত উঠে যেতে পারি।
কদিন আগে লন্ডনের সাবওয়েতে টিউবে উঠেছি। দেখলাম একজন সিনিয়র সিটিজেন খুব কষ্টে টিউবে উঠলেন। আমি তার দিকে আমার হাতটা প্রায় বাড়িয়ে দিচ্ছিলাম, শেষ মুহূর্তে নিজেকে সংবরণ করলাম। হাত বাড়ালে উনি হয়তো অসন্মানিত হতেন। আমার দেশ হলে আমি কিন্তু নিশ্চয় হাত বাড়াতাম। আমি এদেশের মানুষের আন্তরিকতা দেখছি, তাদের বাড়ানো হাত ধরেছি। আমি সন্মানিতই হয়েছি। এখনও বাইবে কোথাও গেলে, বড়ছেলে যখন চট করে আমার হাত ধরে তখন তাকে মনে করাই না যে, এখন আমি হাঁটতে পারি।
তবে আমার এই একপায়ে পথ চলা আমাকে নতুনকরে অনেককিছু দেখতে শিখিয়েছে, ভাবতে শিখিয়েছে, বুঝতে শিখিয়েছে। কতদিন দুপায়ে ভর করে চলতে পারবো জানিনা। তবে এখন বুঝি, চলার জন্য পা থাকাটা সবসময় জরুরী না, চলার পথ চেনাটা জরুরী। আমি সেই পথটাই চিনে গেছি, এখন আর আমার চলতে কোন অসুবিধা নেই।
পাদটীকাঃ
পৌতৃক সম্পত্তির উত্তোরাধিকারী হিসেবে আমি একটা এপার্টমেন্ট পাবো- একটা মধ্যবিত্ত পরিবারের স্বপ্নের ঠিকানা। আমি ডেভেলপারের কাছে প্রথম শর্ত রাখলাম, এমনভাবে ডিজাইন করবেন যেন গ্রাউন্ডফ্লোর থেকে হুইলচেয়ার নিয়ে লিফটে ঢোকা যায়। ভদ্রলোক জানালেন, তার কাছে এমন অনুরোধ এই প্রথম। বাড়ির কাজ এখন প্রায় শেষের পথে, এবার কিছু ইন্টেরিওরের কাজ করতে দিলাম, এক তরুণী আর্কিটেক্টকে। জরুরী নির্দেশনা হিসেবে বললাম, টয়লেটের দরজা যেন স্লাইডিং আর সিটিং আরেঞমেন্টা যেন ডিসেবল ফ্রেন্ডলী হয়। সে জানতে চাইলো কার জন্য, বললাম আমার জন্য। খুব আবাক চোখে বললো, এভাবে কাউকে ভাবতে দেখিনি, বলতেও শুনিনি। আসলে এরকম ভাবনা সবারই হওয়া উচিত।
২২টি মন্তব্য
রেজাউল হুদা কোকো
আপনার পরবত্তীতে সুস্থ হবার কথা শুনে ভালো লাগলো।মন্তব্য এতো বড় হয়ত হয় না।আপনার লিখা ভালো লেগেছে।
Rozy chowdhury
হাসিন জাহান লেখক
হাসিন জাহান লেখক
হাসিন জাহান লেখক
Mazibur Rahman
হাসিন জাহান লেখক
হাসিন জাহান লেখক
সরদার আরিফ উদ্দিন
আপানার ব্লগ ভিজিট করলাম, প্রত্থমেই স্বাগত এরকম একটি উদ্যোগের জন্য। আপনার অভিজ্ঞতার ঝুলি থাকে অনেক কিছুই জানতে পারবো ধীরে ধীরে, অভিজ্ঞতাগুলো ছড়িয়ে পররে এক প্রজন্ম থেকে অন্য প্রজন্মে, সম্রদ্ধ হবে নুতন প্রজন্ম, সেই সাথে আমিও মধ্যবয়সে এসে নুতন আলোয় আলোকিত হব,
খুব মন দিয়ে পড়লাম'আমার এক পায়ে পথ চলা", জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে শেখাগুলো এবং লেখাগুলো অসংখ্য মানুষের কাজে লাগবে এবং আপনার পরবর্তী কার্যক্রমগুলো অনেক জীবন ঘনিস্ত হবে।
অনেক শুভেচ্ছা আপা, ভাল থাকবেন সব সময়
হাসিন জাহান লেখক
Mahbubul Alam
Thank you for your very honest and touching story of life. I also have joint pain problem which is sometimes crippling. Trying to cope with the problem and your story is inspiring. We should not give up hope and continue our endeavour relentlessly until death which is inevitable.
Best wishes for your recovery.
Regards
Mahbub
হাসিন জাহান লেখক
Sujat Barua
Nice story telling. Keep up good job.
Sujat
Toronto, Canada
হাসিন জাহান লেখক
হাসান পারভেজ
চমৎকার।
দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থা,চিকিৎসা সেবা নিতে আসা সাধারন মানুষের দুঃখ আর সুবিধা বঞ্চিত নাগরিকদের চলাচলে অসুবিধার কথার সাথে সাথে প্রকৌশল বিদ্যার প্রয়োগ সংক্রান্ত সীমাবদ্ধতার কথা
দারুণভাবে উঠে এসেছে আপনার এই লেখায়।
আমার প্রজেক্টের নির্মাণাধীন একটি বহুতল ভবনের নীচতলায় রিসিপশান জোনে সিড়ির সাথে হুইল চেয়ার চলাচলের উপযোগী একটি রেম্প তৈরীতে আর্কিটেকচার এবং আমি একমত হয়েছি কিন্তু উর্ধতনদের এ বিষয়ে যে দোদুল্যমনতা তা কাটিয়ে উঠতে আপনার লেখা আমাকে আরও উদ্যোম যোগাবে।
আপনার না বলা কথা অন্যদের চলার পথ সহজ করে দিবে।
Keep it up Apa.
হাসিন জাহান লেখক
তারেক মাহমুদ
হাসিন জাহান লেখক
Md. Sharif Ullah Bhuiyan
অত্যান্ত মনোযোগ দিয়ে প্রতিটি লাইন পড়েছি। অনেক সুন্দর করে আপনার ব্যক্তিগত সমস্যার সাথে চারপাশের অসংগতিগুলো তুলে ধরেছেন। কস্ট এবং ভবিষ্যৎ দিক নির্দেশনা দুটিই খুব সুন্দর করে তুলে ধরেছেন।
পাদটিকা অনুসারে আমাদের সকলেরই এইভাবে চিন্তা করা উচিৎ।
ধন্যবাদ সময় নিয়ে এত সুন্দর করে লেখার জন্য।
মোঃ শরীফ উল্লাহ ভুইয়া
কো-অর্ডিনেটর, সোস্যাল মবিলাইজেশন
ওয়াশ সেক্টর
ঢাকা আহছানিয়া মিশন
হাসিন জাহান লেখক
Georgis
হাসিন জাহান লেখক
মন্তব্য করুন
উত্তর দিচ্ছেন
আপনার ইমেইল প্রকাশ করা হবে না। অনুমোদনের পর মন্তব্য প্রকাশিত হবে।