Skip to content

ফেসবুক বিড়ম্বনা- peer pressure

আমি দীর্ঘদিন ‘ওয়াশ’ (ওয়াটার, স্যানিটেশন, হাইজিন) নিয়ে কাজ করি। পেশাগত দায়বদ্ধতা থেকেই মানুষকে খাবার আগে আর পায়খানার পরে সাবান দিয়ে দুই হাত ভালোভাবে কচলে কচলে ধোয়ার পরামর্শ দেই। দীর্ঘদিন ধরে এ পরামর্শ দিতে দিতে মুখে ফেনা তুলে ফেলেছি, কিন্তু খুব একটা সুবিধে করতে পেরেছি বলে মনে হয় না। খুব সম্প্রতি আমাদের এক তরুণ সহকর্মী পরীক্ষামূলকভাবে তার গোপন ক্যামেরায় অন্যান্য সহকর্মীদের খাবার আগে হাতধোয়ার অবস্থার (পড়ুন দুরাবস্থার) ভিডিও করে। সেই ভিডিওর নায়ক-নায়িকাদের করুণ দৃশ্যের কথা না হয় নাই বললাম!

ইতিমধ্যে নানা গবেষণায় একটি বিষয় উঠে এসেছে যে, হাত ধোয়ার ক্ষেত্রে peer pressure খুবই গুরুত্বপূর্ণ। অর্থাৎ অন্যের উপস্থিতিতে ইচ্ছা না থাকলেও অনেকে বাধ্য হয়ে হাত ধোয়। তবে আমার কাছে এই তথ্য বা তত্ত্বকে খুব বেশি যুতসই মনে হয়নি। তার জ্বলন্ত উদাহরণ দেখা যায় বিয়ে বাড়িতে।টেবিল দখলের প্রতিযোগিতায় পাওয়া প্রথম ব্যাচের জায়গাটা কিছুতেই হারানো চলবে না! তাই পরিবেশকরা যখন সারিবদ্ধভাবে রীতিমতো সমবেত নৃত্যের তালে তালে খাবার পরিবেশন শুরু করেন, তখন অযথা হাত ধুতে গিয়ে জায়গা হারানোর মতো বোকামি করতে সবাই নারাজ। তবে হ্যাঁ, খাওয়া শেষে প্রথমে টিসু ঘষে হাত পরিস্কার করার ব্যর্থ-চেষ্টার পর অনেকেই স্ব-উদ্যোগে হাত ধোয়ার কাতারে সামিল হন। আজকাল আবার অনেক বিয়েতে চামচ-কাঁটাচামচ দেয়ার রেওয়াজ শুরু হয়েছে। তবে কাচ্চির সাথে কাঁটাচামচ বড়ই বেমানান। এতে পেট ভরে, কিন্তু মন ভরে না।

যাহোক, ফিরে আসি মূল কথায়। ফেসবুকের কল্যাণে কমবেশি আমাদের সবার জীবনেই পরিবর্তনের ছোঁয়া লেগেছে। পরিবর্তনের একটা প্রধান কারণ সম্ভবত peer pressure। এখন চারদিকে কেবল 'এনিভার্সারির' ছড়াছড়ি। বিছানায় পাশাপাশি শুয়ে স্বামী স্ত্রীকে শুভেচ্ছাবাণী জানান ফেসবুকে। সাথে রয়েছে কেক কাটার ফরজ বিধান! শুধু বিবাহবার্ষিকী না, আছে জন্মদিনও। স্বামী-স্ত্রী, ছেলে-মেয়ে, মা-বাবা, শালা-শালি ... মধ্যরাতে কেক কেটে ফটো আপলোড। এতেও আপত্তি থাকতো না যদি সাত-সকালে উঠে ফেসবুক দেখতে গিয়ে স্যান্ডগেঞ্জি আর ভুড়ির উপর বাঁধা লুঙ্গি পরে কেক কাটা ছবিটা আপনার নজরে না আসতো।
আরও আছে। দিবস উৎযাপন- বাবা দিবস, মা দিবস, মেয়েশিশু দিবস (অবশ্য ছেলেশিশু দিবস আছে কিনা জানা নেই), ইত্যাদি। কেকের হাত থেকে বাবা-মারও রেহাই নেই। ওই কেক কেটে বিভিন্ন দিবস উপলক্ষে ফেসবুকে বার্তা পাঠানো অনিবার্য, মা-বাবার ফেসবুক একাউন্ট থাকুক বা না থাকুক! দু-সন্তানের একটি পরিবারের উভয় পক্ষের বাবা-মা মিলিয়ে পরিবারিক এনিভার্সারির সংখ্যা দাঁড়ায় গড়ে কমপক্ষে ১৩টি- বারো মাসে তের পার্বণ যাকে বলে! এসবে মার্ক জুকারবার্গের কতটা লাভ হয় জানি না।তবে বেকারির কেকের ব্যবসা রমরমা। সবই peer pressure! হাত ধোয়ার ক্ষেত্রে কার্যকর না হলেও ফেসবুকে হয়েছে।

এবার আসি, আমার ব্যক্তিগত প্রসংগে। আমার শাড়ির সংখ্যা গণনাযোগ্য। যারা আমাকে চেনেন, তারা অবশ্য সন্দেহ পোষণ করতে পারেন। তাদের জন্য বলি- খুব বেশি পছন্দ না হলে আমি শাড়ি কিনি না। তবে আমার সব শাড়ি খুব যত্নে রাখি বলে, এমনকি আমার মায়ের রেখে যাওয়া শাড়িও যখন পরি, অনেকে নতুন ভেবে ভুল করেন। যে ধরনের চাকরি করি তাতে প্রায় সময়েই নানা অনুষ্ঠানে সামনের সারিতে বসতে হয় বা ছোটখাট বক্তৃতা দিতে হয়। ফেসবুকে ছবির ছড়াছড়ির কারণে খুব কাছাকাছি সময়ে আরেকটি অনুষ্ঠান হলে সেই শাড়িটা আর পরা হয় না। আগে একই শাড়ি পর পর কয়েকটা বিয়েতে চালিয়ে দিতাম, বিশেষ করে ডিসেম্বরের বিয়ের মৌসুমে। এখন তো সেখানেও সমস্যা! নিয়মমাফিক বর-কনের সাথে লাইনে দাঁড়িয়ে ফটো তোলার সুযোগ পাবেন, বোনাস হিসেবে দু-চারজন ঘনিষ্ট/পরিচিত অথবা ফেসবুক ফ্রেন্ডের সাথে দেখা হলে, কটা সেল্ফি এবং প্রায় সাথে সাথে আপলোড। অতএব পরবর্তী বিয়ের অনুষ্ঠানে ওই শাড়ি পরার সুযোগ রুদ্ধ! ওই যে বললাম, peer pressure!
তবে এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির মোকাবিলা করার জন্য আমি বরাবরই সচেতন। খুবই নিয়মতান্ত্রিকভাবে একটা শাড়ি একবার পরা হলে, তা আলাদা ওয়ারড্রোবে রাখি এবং মোটামুটি একটা লম্বা সময় পরে আবার সেটা পরি। কদিন আগে 'মৃত্তিকা দিবস' উদযাপন উপলক্ষ্যে সাজগোজ করে গাড়িতে বসে আয়েশ করে ফেসবুক খুলেছি, যাতে যানজটের প্রভাব কোনোভাবেই আমার চেহারায় বিরক্তির ছাপ না ফেলে। কিন্তু ওমা, একি! ফেসবুকের মেমোরিতে ভেসে উঠলো আমার গত বছরের মৃত্তিকা দিবসের ছবি।দেখি আমি একই শাড়ি পরে আছি!

3 comments

  1. Mukta Khanam

    Apa Darun .Interesting Entertainment
    1. Hasin

      Thanks a lot, apa!
    2. হাসিন জাহান Author

      Thank you :-)

Leave a comment

Replying to

Your email is never published. Comments appear after approval.

You may also like

All writing
Reflections

এই আইটেম

বাংলাদেশে আমাদের কাজ দেখতে আফ্রিকার চারটি দেশ থেকে ওয়াটারএইডের প্রতিনিধিদের আগমন। স্বভাবতই মাঠের কাজ দেখানোর পাশাপাশি তাদের সার্বিক যত্ন-আত্তির ভারও আমার উপর। তাদেরকে নিয়ে সাতসকালে প্লেনে চেপে সৈয়দ...

Hasin Jahan 2 min

Age is NOT just a number!

Reflections

Age is NOT just a number!

আমাদের যাদের বয়স একটু বাড়তির দিকে তাদেরকে উদ্দেশ্য করে অনেকেই বলেন, 'age is just a number - মনের বয়সটাই আসল'। উৎসাহ দেবার জন্য হলে বিষয়টি ঠিক আছে, কিন্তু বাস্তবে ততটা সত্য নয়। মাঝবয়স পেরুলে আগের...

Hasin Jahan 2 min

আমি একজন সেকেন্ড ক্লাস নাগরিক

Reflections

আমি একজন সেকেন্ড ক্লাস নাগরিক

মেয়ে হয়ে জন্মানোর ব্যাপারটা অনেকটা দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিকের মতো! কেমন করে? একটু ভেঙেই বলি। তা, বহু বছর আগের কথা। তখন আমার বয়স আট কি দশ।বিকেল হলেই বাইরে খেলতে যেতাম। হঠাৎ একদিন সমন জারি হলো- বড় হয...

Hasin Jahan 2 min