ছেলেদের জীবনের বিড়ম্বনা
Hasin Jahan
3 min read
অনেকদিন ধরেই আমার একটা লেখা পেন্ডিং ছিল। পাবলিক ডিমান্ড-এর কারণে এবারে আমার সেই লেখা - ছেলেদের জীবনের নানা বিড়ম্বনা নিয়ে। অনেকে বলেন, আমি মেয়েদেরকে নিয়ে বেশি লিখি। তাই তাদের দাবি, ছেলেদের কি অন্তর-জ্বালা বা কষ্ট নেই? অবশ্যই আছে। আজকের এই লেখায় শুধুমাত্র কয়েকটা বাস্তব ঘটনা তুলে ধরছি। ভেবে দেখুন, এ ধরনের ঘটনাগুলো আপনার চারপাশে ঘটছে কি না?
আমার এক সহকর্মী, রাশভারি, সকলের কাছে সম্মানীয়। প্রায় গোটা সাতেক ভাইবোন। সবাই উচ্চপদস্থ চাকরি বা ব্যবসা করেন। কেউ কারো চেয়ে কম নয়! সাত সন্তানের জন্ম দিলেও, উনাদের মা সে আমলে বেশ অল্প বয়সেই বিধবা হন। এই বিধবা মায়ের অক্লান্ত পরিশ্রমে পুরো সংসারটা দাঁড়িয়ে গেল। ছেলেমেয়েরা ঈর্ষণীয় জায়গায় পৌঁছে গিয়ে তাকে দিলেন রত্নগর্ভার সম্মান। কিন্তু তাতে কী! শেষবেলায় এসে তাঁকে ছেলেদের বাসাতেই সাইক্লিক অর্ডারে ঘুরপাক খেতে হচ্ছিল। সহধর্মিণীর কঠোরতায় হার মেনে সহকর্মী সাইক্লিক অর্ডারের বাইরে থাকার সৌভাগ্য অর্জন করেছিলেন। একসময়ে উনার মায়ের ডিমেনশিয়া বাড়াবাড়ি পর্যায়ে যাওয়ায় বাধলো আসল বিপত্তি। তিনি প্রতিদিনই কোনো-না-কোনো অদ্ভুত কাণ্ড ঘটান। তাকে সামলাতে বিপত্তি চরমে ওঠায় ভাইদের মধ্যে ঠেলাঠেলি বাড়তে থাকলো আর বোনেরা হলেন নীরব! এক পর্যায়ে আমার সহকর্মীর উপর ভাইদের চাপ বাড়তে থাকলো। আর কতদিন দ্বায়িত্ব এড়িয়ে থাকবেন! ভদ্রলোকের স্ত্রী তো খুন কবুল, তবু শাশুড়ি কবুল না! একদিন মন খারাপ করে তিনি আমার কাছে জানতে চাইলেন, আপনি তো ‘ওল্ড হোম’ নিয়ে কাজ করেন। এমন কোনো পরিবারের খোঁজ দিতে পারবেন, যারা আমার মাকে দেখেশুনে রাখবেন? বিনিময়ে তাদেরকে মা-সহ একটি ফ্ল্যাটে থাকার ব্যবস্থাসমেত আর্থিক খরচ বহন করতে ইচ্ছুক তিনি। যাহোক, শেষ অব্দি ভদ্রলোককে বিপদের হাত থেকে মুক্তি দিয়ে এই কথোপকথনের মাত্র কদিন পরেই তার রত্নগর্ভা সেই মা এ পৃথিবী থেকে বিদায় নিলেন।
এরপরে আর এক পরিচিতের ঘটনা। উনার ঢাকায় মাত্র তিনটে ফ্ল্যাট, সাথে শহরে এবং গ্রামের বাড়িতে যথেষ্ট পরিমাণে জমিজমা রয়েছে। ভদ্রলোক তার ভাইদের মধ্যে অন্যতম শিক্ষিত। ঢাকায় উচ্চপদস্থ চাকরি করেন। উনার ছোট দুইভাই খুব একটা পড়াশোনা করেননি, তারাই গ্রামের বাড়ির ওই জমিটুকুতে করে-কেটে খাচ্ছিলেন। তাতে কী? সব ছাপিয়ে স্ত্রী-সন্তানদের আগ্রহ গ্রামের সেই জমিটুকুর উপরেই। প্রায়ই ভদ্রলোকের স্ত্রী, তার ছেলেমেয়ে-সমেত উনাকে নিয়মিতভাবে চাপ দিতেন যেন, গ্রামের জমি বেচে টাকা আনেন অথবা জমিতে যেটুকু ফসল হয়, সেগুলো ঢাকায় নিয়ে আসেন। ভদ্রলোকের ছিলেন উভয় সংকটে। গ্রামের দরিদ্র ভাইবোনদেরকে বঞ্চিত করে, এমনকি শুধুমাত্র নিজের অংশটুকু দাবি করতেও তিনি আগ্রহী না। এত বিষয়-সম্পদ থাকার পরেও সেই 'দুইবিঘা ভুঁই' আনতে না পারার জন্য স্ত্রী-সন্তানদের কাছে প্রতিনিয়ত লাঞ্ছিত হতেন।
আরেক পরিচিতের ঘটনা। কদিন আগেই তার বাবা মারা গেলেন। যতদিন বেঁচে ছিলেন, মা আর বাবা একসাথে গ্রামের বাড়িতেই ছিলেন। বাবা হঠাৎ করে মারা যাওয়াতে বাধলো বিপত্তি। একলা ঘরে গ্রামের বাড়িতে মাকে রাখবেন কীভাবে? এর মাঝেই হঠাৎ করে মা অসুস্থ হয়ে পড়লেন। দায়িত্বশীল বড় ছেলে হিসেবে তিনি অ্যাম্বুলেন্সে করে ঢাকায় চিকিৎসা করাতে নিয়ে আসলেন। চিকিৎসা শেষে মাকে বাসায় নেয়ার সুযোগ নেই। অতএব ছোট ভাইয়ের হাতে টাকা গুঁজে দিয়ে তার বাড়িতে পাঠিয়ে দিয়ে নিজে জান বাঁচালেন।
খুব প্রচলিত আরেকটা চিত্র। একাধিক ভাইবোন থাকলে, খুব সন্তর্পণে বৃদ্ধ বা অসুস্থ বাবা-মাকে দেখার দায়িত্ব চাপিয়ে দেয়া হয় অপেক্ষাকৃত দুর্বল, কম-রোজগেরে ভাইটির উপর। সুকৌশলে আর্থিকভাবে দূর্বল সেই ভাইয়ের হাতে কিছু টাকা গুঁজে দিয়ে বাকি ভাই-বোনেরা দায়মুক্ত হতে চান। এই ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী আমি নিজে, সুতরাং নতুন করে আর বলার কিছু নেই।
Comments
No comments yet. Be the first to share your thoughts.
Leave a comment
Replying to
Your email is never published. Comments appear after approval.